1. »
  2. আন্তর্জাতিক

চবিতে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পর চারশ’র অধিক নিয়োগ, মূল্যায়ন হয়নি জুলাই শহীদ পরিবার ও আহতদের

রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:৪৫ পিএম | আপডেট: রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:৪৫ পিএম

চবিতে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পর চারশ’র অধিক নিয়োগ, মূল্যায়ন হয়নি জুলাই শহীদ পরিবার ও আহতদের

চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটের উপর দাঁড়িয়ে গত ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বে আসেন সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার ও বর্তমান দুই উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান (একাডেমিক) ও অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন (প্রশাসনিক)। তাদের দায়িত্ব থাকাকালীন বিশ্ববিদ্যালয়টিতে গত ১৮ মাসে ৪০০ এর অধিক নিয়োগ কার্যক্রম সংঘটিত হয়। প্রথম দিকে প্রশাসনের তরফ থেকে জুলাইয়ে শহীদদের পরিবার ও আহতদের বিশ্ববিদ্যালয়টিতে চাকরির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রত্যাশা দেওয়া হলেও, বাস্তবিক শত শত নিয়োগের ভিড়েও যাদের রক্তের বিনিময়ে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মিত সেই শহীদ হৃদয় চন্দ্র তরুয়া ও শহীদ ফরহাদ হোসেনের স্বজন এবং জুলাই বিপ্লবে চোখ হারানো মো. শুভ হোসেনের মতো জুলাই যোদ্ধারা পায়নি তাদের সঠিক মূল্যায়ন ও মর্যাদা।  

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০তম উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার দায়িত্ব গ্রহণের পর তার দায়িত্বের প্রায় ১৮ মাসে একাধিক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে চারশ'র অধিক জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও তার নেতৃত্বে শুরু হওয়া আরও একাধিক পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনও চলমান রয়েছে, যার একটি বড় অংশ চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। সম্প্রতি উপাচার্য পরিবর্তন হলেও এই নিয়োগ কার্যক্রম ঘিরে বিতর্ক থামেনি।

ইউজিসি ও মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা উপেক্ষা, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও একাধিক পদে নিয়োগ, বিভাগীয় প্ল্যানিং কমিটির মতামত উপেক্ষা, সংশ্লিষ্ট কমিটির অনুমোদন ছাড়া নিয়োগ প্রক্রিয়া চালানো,  স্বজনপ্রীতি, জামায়াতের দলীয় প্রভাবে নিয়োগ সহ নানান বিতর্ক ঘিরে ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গত ১৮ মাসের নিয়োগ প্রক্রিয়া। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানে চোখ হারানো বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী মো. শুভ হোসেন এবং দুই শহীদ শিক্ষার্থী হৃদয় চন্দ্র তরুয়া এবং ফরহাদ হোসেনের পরিবারের প্রতি সম্পূর্ণ উপেক্ষা স্পষ্ট ছিল এই নিয়োগ কার্যক্রমে। 

জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল দলীয় প্রভাবমুক্ত নিয়োগ নিশ্চিত করা, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি বন্ধ করা এবং বৈষম্যহীন প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সাবেক উপাচার্য ও তার প্রশাসন এসব লক্ষ্যকে পাশ কাটিয়ে ব্যক্তিগত এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়েছে বলে দাবি শিক্ষার্থীদের। অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার তার দায়িত্বকালে নিজেকে ‘তুচ্ছ ভিসি’ তথা সীমিত ক্ষমতার ভিসি হিসেবে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে নিয়োগের প্রতিটি ধাপে তার প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবশালী ভূমিকা ছিল স্পষ্ট।

নিয়োগ কার্যক্রমে তৎকালীন প্রশাসন এতটাই নিমগ্ন ছিল যে, চবির ২ নম্বর গেটে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের সংঘর্ষে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাতেও তারা কোনো তাৎক্ষণিক কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। ঐ সংঘর্ষকালীন মুহূর্তেও প্রশাসন নিয়োগ প্রক্রিয়া চালিয়ে যায় এবং নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনীর সহায়তা চায় বলে বিশ্ববিদ্যালয়টির সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা গিয়েছে। 

তথ্য রয়েছে, সংঘর্ষের ঘটনার দিন শত শত শিক্ষার্থী যখন স্থানীয়দের গুরুতর হামলার শিকার হয়ে হাসপাতালে যাচ্ছিল, তখনও প্রশাসন ছিল নিয়োগ বোর্ডে। শিক্ষার্থীদের দাবি, ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপত্তা নয়, বরং নিয়োগ সম্পন্ন করাই ছিল তৎকালীন প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার। সাম্প্রতিক উপাচার্যের পদ পরিবর্তনের পর শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সহ সকল পর্যায়ে এই নিয়োগ কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। 

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী জুলাই আহত যোদ্ধা মো. শুভ হোসেন দৈনিক দিনকালের চবি প্রতিনিধি আল ইয়ামিম আফ্রিদি কে বলেন, “জুলাইয়ের পর যখন প্রশাসন গঠিত হয়, প্রশাসন থেকে অনেক আশা দেখানো হয়েছিল শহীদ ফ্যামিলি এবং গুরুতর আহতদের। কিন্তু আসলে কিছুই করা হয়নি।” তিনি আরও বলেন, “১৬ জুলাই দৃষ্টিহারনোর পর থেকে, স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করা অসম্ভব অনেকটা পরিবারের বোঝা হিসেবে বেঁচে আছি৷ আমরা যারা পঙ্গুত্বের শিকলে বন্দি আছি, আমি  বিশ্বাস করি- সরকার আমাদের সক্ষমতা, যোগ্যতা ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় ন্যায়সংগত ও টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।”

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান চৌধুরী বলেন, “জামাত প্রশাসন চবিতে ১৮ মাস রাজত্ব করেছে। ৪২৫ জন নিয়োগ দিয়েছে। ফারহাদ, তরুয়ার স্বজনরা চাকরি পায়নি। এর থেকে আর বড় বৈষম্য কি হতে পারে!”

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল ফোরকান দৈনিক দিনকালের চবি প্রতিনিধি আল ইয়ামিম আফ্রিদি কে বলেন, “ওদের (জুলাই যোদ্ধা) রক্তঝরা ইতিহাসের মধ্য দিয়েই আমরা এই নতুন বাংলাদেশের অবস্থা ফিরে পেয়েছি। 

আমার সাথে শহীদ ফরহাদ হোসেনের ভাই দেখা করেছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাদের জন্য আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিব ইনশাল্লাহ।”