1. »
  2. মতামত

জিয়া পরিবারের নিরাপত্তা ও এক আনসিন আর্মি

বুধবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬ ১১:০৪ এএম | আপডেট: বুধবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬ ১১:০৪ এএম

জিয়া পরিবারের নিরাপত্তা ও এক আনসিন আর্মি

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নিরাপত্তা শুধু দলের নয়, রাষ্ট্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সেটি বিবেচনা করেই হয়তো ২৫ ডিসেম্বর যখন তারেক রহমান দেশে ফেরেন, তখন সরকার তার নিরাপত্তায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চার হাজার সদস্য ছাড়াও বিএনপি চেয়ারপারসনের সিকিউরিটি ফোর্স (সিএসএফ) বিজিবি, র‌্যাব, সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছেন। এর বাইরে দলীয় স্বেচ্ছাসেবী এবং নিরাপত্তা তো রয়েছেই। কিন্তু তারপরও ব্যক্তি তারেক রহমান ও তার পরিবারের নিরাপত্তায় এমন একজন রয়েছেন, যাকে অনেকেই চিনেন না আবার অনেকে চেনেন জিয়া পরিবারের একান্তজন হিসেবে। কিন্তু আমি যতটুকু জানি, জিয়া পরিবারের নিরাপত্তাসহ সার্বিক দেখভালে তিনি অন্যতম। তবে তিনি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি নন। তার নাম আতিকুর রহমান রুমন। বর্তমানে তিনি আমরা বিএনপি পরিবারের আহ্বায়ক। প্রায় দুই যুগের পরিচয়ে যাকে ঘুণে ধরা সমাজে সততা, ন্যায়নিষ্ঠা এবং নির্লোভের প্রতীকও বলা যায়। ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থেকেও তাকে কখনো গর্ব বা অহংকার করতে দেখিনি। তিনি তার সততা ও ন্যায়নিষ্ঠা দিয়ে জিয়া পরিবারের অন্যতম ভরসার প্রতীকও হয়ে উঠেছেন। বিপরীতে শেখ হাসিনার বেলায় তার পরিবারের অনেকে রাজনৈতিক পদ-পদবিতে ছিলেন, তবে তার নিরাপত্তায় এমন কেউ ছিল কি না জানা নেই। যিনি তাকে সঠিক বুদ্ধি-পরামর্শ এবং ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে পরিমার্জিত করতেন। 

তারেক রহমানের উঁচু হাতের নিচে দুই হাত দুই দিকে প্রসারিত করে দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে থাকা এই ব্যক্তিই আতিকুর রহমান রুমন। যাকে সবাই রুমন ভাই নামে চেনেন। অনেকটা নিরাপত্তারক্ষী কিংবা সিকিউরিটি ফোর্স যেভাবে ভিআইপিকে আগলে রাখে, ঠিক সেভাবেই তারেক রহমান ও তার পরিবারকে আগলে রাখার মূল ভূমিকায় থাকেন আতিকুর রহমান রুমন। রাজনৈতিক পদ-পদবিধারী কিংবা আইনশৃঙ্খলা অথবা গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য না হয়েও জিয়া পরিবারের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করা আতিকুর রহমান রুমন কতটা বিশ্বস্ত হলে, এমন চ্যালেঞ্জিং কাজটি করছেন তা বুঝতে কারও বাকি থাকার কথা নয়। নীরবে-নিভৃতে থাকা এই ব্যক্তিটি জিয়া পরিবারের ছায়া হয়ে নিরাপত্তার চাদরের ভূমিকা পালন করছেন, যা অনেকটা গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের মতো। 

উল্লেখ্য, সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম শামসুল ইসলামকে দলের চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয় বিএনপি। এর বাইরেও তারেক রহমানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় ছাত্রদল-যুবদলের একটি শক্তিশালী গ্রুপ ও সিএসএফ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো তো রয়েছেই (এই মুহূর্তে যদিও রাষ্ট্রীয় বাহিনী আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করতে গেলে নানা বিধি-বিধানের বিষয় রয়েছে)। 

যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল, তখনও তারেক রহমানের আশপাশের অনেককে ঘিরে নানা রকম অভিযোগ উঠলেও এ সবকিছুর ঊর্ধ্বে ছিলেন আতিকুর রহমান রুমন। আওয়ামী সরকারের ১৬ বছরে ঝড়ঝাপটা কম যায়নি তার ওপর দিয়ে। তারপরও দেশ ছাড়েননি। অবিচল থেকে তারেক রহমানের নির্দেশনা পালন করেছেন। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ঘর ছাড়া থাকতে হয়েছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। 

দুটি ঘটনা বলি- এক. বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার পর র‌্যাব-১ রুমন ভাইকে ডেকে পাঠায়। তিনি আমাকে নক দিলেন এবং সঙ্গে যেতে বললেন। কথামতো, র‌্যাব-১ এ যাই। গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশের আগে বললাম, ভয়ের কিছু নেই। বাইরে অপেক্ষায় থাকব (যাওয়ার আগে র‌্যাবের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলি, যেন তাকে সসম্মানে কথা বলে বিদায় দেওয়া হয়। উনি আমাকে নিশ্চয়তা দেন)। বেলা ১১টায় ঢুকলেন, ১ ঘণ্টা চলে গিয়ে ২ ঘণ্টা চলে যাচ্ছে। তারপরও রুমন ভাই বের হচ্ছেন না। এক পর্যায়ে র‌্যাবের ওই শীর্ষ কর্মকর্তাকে রিং দিই। তিনি জানান, এখনই কথা বলে তাকে বিদায় দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। এরপরও আধঘণ্টা চলে গেছে, কিন্তু রুমন ভাই বের হচ্ছেন না। আবারও রিং দিই। তিনি জানান, এখনই বেরিয়ে আসবে। অনেক বিষয়ে কথা বলছে, তাই একটু সময় লেগেছে। এ জন্য তিনি সরিও বলেন। কিছুক্ষণ পর রুমন ভাই বেরিয়ে এলেন। জানতে চাইলাম, ভেতরে কী হয়েছে কিংবা দুর্ব্যবহার করেছে কি না? মাথা নাড়িয়ে বলেন, ইলিয়াস আলী গুমের আন্দোলন নিয়ে যেন বেশি বাড়াবাড়ি না করি। বিএনপি কার ইন্ধনে আন্দোলন করছে, কে অর্থ সহযোগিতা করছে, তার সঙ্গে তারেক রহমানের যোগাযোগ হয় কি না? ইত্যাদি...। এর বাইরে অন্যান্য বিষয় নিয়ে অনেকটা ভয়ভীতির দেখানোর কথাও বললেন তিনি। সান্ত্বনা দিলাম, আটকে রাখেনি এই বলে। অনেকটা হাফ ছেড়ে বাঁচার মতো, র‌্যাব-১-এর গেট থেকে একটি সিএনজিতে বেরিয়ে এলাম তেজগাঁওয়ের উদ্দেশে। 

দুই. রুমন ভাই এক রাতে জরুরি রিং দিলেন গুলশান-১ নম্বরে দেখা করতে। কথা অনুযায়ী, গেলাম ঠিক, কিন্তু তিনি একটি গাছের নিচে অন্ধকারে নিয়ে গেলেন। বললেন, সিসি ক্যামেরায় চেহারা দেখা গেলে আমার চেয়ে বেশি আপনার ক্ষতি হবে। তারপর তিনি বলতে থাকলেন, গ্রামের বাড়িতে থাকি না- এটা প্রশাসনও জানে। তারপরও এনএসআই এবং পুলিশ বাড়িতে গিয়ে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। বাড়ি-ঘরের জিনিসপত্র তছনছ করেছে। কী করা যায়? উত্তর কী দেব? কিছুটা চুপ থেকে বললাম, ওদের কোনো লেবেল থেকে বললেও কাজ হবে না। ওদের একটাই উত্তর হবে, ওপরের নির্দেশে করছে বা করতে হচ্ছে। বরং আগে আপনি নিরাপদ থাকেন, তারপর বাড়ির চিন্তা করেন। আপনাকে ধরতেই হয়তো এমনটা করছে। তাই কোনোভাবেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে পড়া যাবে না। 

পটপরিবর্তনের পর বিএনপির মিছিলে মানুষের ভিড় দেখে ভাবি, জুলাই আন্দোলনের আগেও বিএনপির মিছিলে হাতে গোনা মানুষ দেখা যেত। অথচ সুযোগ সন্ধানীদের ভিড়ে প্রকৃতদেরও খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই সময়ে অনেকেই তারেক রহমানের কাছের লোক পরিচয়ে স্বার্থ উদ্ধারে নেমেছেন। অনেকে এরই মধ্যে নিজেদের গুছিয়েও নিয়েছেন। কিন্তু রুমন ভাইয়ের দায়িত্ব বেড়েছে। জিয়া পরিবারের সততার পরীক্ষায় তিনিই এখন অন্যতম। যার কারণে পুরো পরিবারকে আগলে রাখার কঠিন দায়িত্বটাও যেন তার কাঁধে। সততা, নির্লোভ এবং নিরহংকারী রুমন ভাই অনেকটা জিয়া পরিবারের নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা পালন করছেন। এমন একজন ব্যক্তি ক্ষমতাকে কেন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন না, এমন প্রশ্ন অনেকের মনে উঁকি মারতে পারে। উত্তর দিয়েছেন এভাবে, একদিন তো বলেই ফেললেন, আমার এক সন্তান। বাড়ি-গাড়ি, টাকা-পয়সা দিয়ে কী করব? কবরে তো নেব না? তারেক রহমান দেশে আসার আগে তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান দুবার দেশে এসেছেন। 

অনলাইন এবং টেলিভিশন ভিডিওয়ের দৃশ্যে রুমন ভাইকে তার পাশে নিরাপত্তার অতন্দ্রপ্রহরী হিসেবে দেখা গেছে। তারেক রহমান যখন দেশে এলেন, ঠিক তখনও একই দৃশ্য দেখা গেছে। অর্থাৎ তারেক রহমান পরিবার যে কজনকে বিশ্বাসের ওজনে নিক্তি দিয়ে মেপেছেন, তার মধ্যে প্রথম সারির একজন তিনি। অথচ কেউ কেউ তারেক রহমান ও তার পরিবারের আপনজন পরিচয়ে ফায়দা যেমন নিচ্ছেন, তেমনি কাছে ভেড়ার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছেন। এমনই একজনের নাম ধরে বললেন, বর্গাচাষি যখন মালিকের ভূমিকায় থাকে। তখন প্রকৃতরা হারিয়ে যায়...। 

সততার পরীক্ষায় ভালো থাকতে হবে আতিকুর রহমান রুমনকে। যদি পথ হারান, তা হলে আপনাকে নিয়ে এই লেখা মিথ্যায় পর্যবসিত হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো তো লেগেই আছে। পান থেকে চুন খসলে যেভাবে আইনি খড়গে পড়বেন। তেমনি জেলের ভাতও নিশ্চিত। তাই চাই না, ন্যায় ছাড়া অন্যায়ের পথে হাঁটুন। 

নোট. রাজনীতি-সংশ্লিষ্টদের নিয়ে লিখতে গেলে দশবার ভাবতে হয় তাদের অপরাজনীতির কারণে। অর্থাৎ কে কোন দল করে, সেটি খোঁজা শুরু করে কিংবা কী বেনিফিট আছে, সেটি খুঁজতে চায়। এই লেখার বেলায় এমনটি খোঁজা অস্বাভাবিক নয়। তারপরও বলে রাখি, পেশাগত সম্পর্কের বাইরে ভিন্ন কোনো সম্পর্ক নেই। আপনি ভুল করলে আপনাকে নিয়েও লিখতে চাই। 

ফইয়সাল আলম, সিনিয়র সাংবাদিক